মঙ্গলের অদ্ভুত ভূত

0 Shares
0
0
0
0

সাল ২০৯৯।

আর মাত্র কিছুদিন পরেই পৃথিবী প্রবেশ করবে নতুন এক সভ্যতায়। প্রযুক্তির মহা মহা আবিষ্কারে মানুষ এখনো আকাশগঙ্গা ছায়াপথের সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রানী। এ পৃথিবী থেকে ভূতেরা বিদায় নিয়েছে প্রায় পঞ্চাশ বছর হতে চললো। ভূতেরা এখন মঙ্গল গ্রহে রাজত্ব করছে। ভূতেরা পৃথিবী থেকে যে কটি কারণে বিদায় নিয়েছে, তারমধ্যে শব্দ দূষণ অন্যতম। আজেবাজে ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ ভূতেদের একদমই সহ্য হয় না। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে মানুষ যখন সবেমাত্র মঙ্গলকে নিজেদের নতুন ঠিকানা করার কথা ভাবতে শুরু করেছে, ভূত জনগোষ্ঠী সদলবলে মানুষের দখলের আগেই নতুন বাসস্থান হিসাবে মঙ্গলকেই আদর্শ হিসাবে মেনে নিল।

আজ পৃথিবীর সকল ভূতেরা মঙ্গলগ্রহে দিব্যি আরামে শুয়ে বসে দিনকাল পার করছে। এখানে না আছে গাড়ির হর্ন, না আছে বিটকেলে লোকেদের কারখানার গুরুম গুরুম আওয়াজ।

এমনই এক অতি অন্ধকার ঘোর অমাবস্যায় মঙ্গলগ্রহে যখন ভূতেদের উৎসব চলছে, কয়েকটা মাথামোটা রোবটকে মঙ্গলে ঘুরতে দেখা গেল। ভূতেরা তাতে অতিশয় বিরক্ত হলো।

“রোবটগুলো কি চায়?”

“ছবি তুলছে কেন কিটকিট করে?”

“শালাগুলার ঘাড়টা মটকে দে তো, Nonsense.”

রোবটগুলোকে পাত্তা না দিয়ে অমাবশ্যা পালন আবার শুরু হলো। কিন্তু রোবটগুলো এত হাই ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ করছিল, সাজু নামের ভূতটার মাথা বিগড়ে গেল (বেচারা এমনিতেই রগচটা), দুম করে একটা রোবটের মাথায় লাথি মেড়ে বসলো। ওমনি রোবটটা ভেঙ্গে গড়াতে গড়াতে মঙ্গলের মাটিতে আছড়ে পড়লো। রোবটটার মাথায় তখনও এলইডি আলো জ্বলছে। আস্তে আস্তে বাতিটিও নিভে গেল।

রোবট লাথিমারার পরদিন পৃথিবীর নাসায় বড় স্ক্রিনে বিজ্ঞানীদের একটি দল দেখতে পেল কথা নাই বার্তা নাই কিসের যেন আঘাতে একটি রোবটের মাথা খুলে পড়ে গেল। উৎসুক বিজ্ঞানী জনতা কয়েকবার ফুটেজ চেক করার পরেও যখন কোন কিছু দেখতে পেল না, সবাই একটু ঝিমিয়ে পড়লো। সেই ঝিমানো অবস্থাকে ফুঁ দিয়ে তরুণ বিজ্ঞানী ফুসু চিৎকার করে বলে উঠলো, “এলিয়েন!”


অমাবস্যা পালন শেষ করে ভূতেরা যখন ক্লান্ত, মঙ্গলের এক ভারতীয় ভূতকে চিন্তিত গলায় বলতে শোনা গেল, “ভাবসাব সাফ নেহি হ্যা।”

ভারতীয় ভূতটার নাম সুধীর। ভূত লোকটির বুদ্ধি বিবেচনা বরাবরই ভাল। তাই অন্য ভূতেরাও একটু মনোযোগ দিল। সুধীর বললো, “মানুষ দলবল নিয়ে মঙ্গলে আসতে চাইছে। এইজন্যই সব যাচাই করতে রোবট পাঠিয়েছে।”

কথাটা প্রায় সবারই যুক্তিযুক্ত মনে হলো।

“তাহলে এখন কি করা যায়?”

বেশ ভাবনায় ডুবে রইলো ভূতেদের দল। প্রায় কয়েক ঘন্টা এভাবেই কেটে গেল। সুধীর ভূত ক্ষানিকবাদে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। “কমিউনিকেশন করতে হবে।”

“কোথায়? কেন? কিভাবে?”

“মানুষের সাথে কমিউনিকেশন করতে হবে।”

এ কথা শুনে ভূতেদের সবাই তখন সুধীরকে ঘিরে বসলো। ভূতের রাজা টাজা কেউ নেই। সবাই মিলে গনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যেটা সিদ্ধান্ত হয় সেটাই বাস্তবায়িত হয়। সুধীর সবাইকে বোঝাতে লাগলো, “পৃথিবীতে সিগন্যাল পাঠাতে হবে যে আমরা মঙ্গলগ্রহের দখলে আছি। শান্তিপূর্ণ বার্তা। এখানে কোন হাংকিপাংকি চলবে না।”

সবাই একস্বরে বললো, “ঠিক। নো হাঙ্কি পাংকি ইন মার্স।”

জাপানিজ এক ভূত বললো, “কিন্তু কিভাবে এই সিগন্যাল পাঠানো যায়?”

আমাদের মাঝে কি নাসার কোন সায়েন্টিস্ট নেই? আমরা যখন পৃথিবী থেকে রওনা দিলাম, একজন তো বোধকরি ছিল। তার কথাতেই তো আমরা দুইদিন চাঁদে জিরিয়ে তারপর মঙ্গলে এলাম। আলবার্ট না কি যেন নাম? সে কোথায়?”

অনেক খোঁজাখুঁজির পর আলবার্টকে হাজির করা হলো। আলবার্ট নিরীহ প্রকৃতির ভূত। ছোটবেলা থেকে আলবার্ট আইনস্টাইন নামক বিজ্ঞানীর ভক্ত হবার কারণে সবাই তাকে আলবার্ট বলে ডাকে।

আলবার্ট মাথা চুলকিয়ে বললো, “এসব কি এখন আমার পক্ষে সম্ভব? পঞ্চাশ বছর আগের প্রযুক্তি আর আজকের প্রযুক্তির মধ্যে যে বিশাল তফাৎ! আর এই গ্রহে এসে তো আমি বিজ্ঞানচর্চা ছেড়েই দিয়েছি। আমার দ্বারা এ কর্ম হবে না।”

সাজু ভূত রেগে বললো, “একটা লাথি দিলেই সুরসুর করে বের হবে। তুই ই বানাবি ট্রান্সমিটার। এই নে ভাঙ্গা রোবটের হাড্ডিগুড্ডি আর মাথা। যেভাবেই হোক ট্রান্সমিটার তোকে বানাতেই হবে।”

আলবার্ট পড়লো ফেসাদে। এ কি বিপদ! নিরীহ আলবার্ট সবার চাপে দায়িত্ব গ্রহণ করলো সত্যি, তবে মনে মনে নিজেও ভরসা পেল না।

আরো দুই অমাবশ্যা কেটে গেল। বেচারা আলবার্ট এরমধ্যে বহু কষ্টে একটা ট্রান্সমিটার বানিয়েছে। যন্ত্রটা ভূতেদের কথা তরঙ্গ করে পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে। ভূতেদের মধ্যে টানটান উত্তেজনা। যন্ত্রটাকে ঘিরে বসেছে সবাই। সুধীর ভূতের কথায় প্রথম বার্তাটি পাঠানো হলো, “Hi!”

আলবার্টের পাঠানো বার্তাটি পৃথিবীতে এলো পরদিন। নাসার বড় কম্পিউটারের স্ক্রিনে কোন এক বিচিত্র কারণে একটি শব্দ ভেসে উঠলো, “Bye!”

বিজ্ঞানী ফুসু এলিয়েনের পাঠানো Bye দেখে চিৎকার করে সবাইকে ডেকে আনলো। সবার তখন মাথার চুল ছেড়ার মতো উত্তেজনা। নতুন শতাব্দীর প্রারম্ভে দাঁড়িয়ে এলিয়েনদের সাথে সফল যোগাযোগ! ভাবাই যাচ্ছে না। নাসার প্রধান শেক্সপিয়র সাহেব বললেন, “ফুসু, তুমি যেহেতু বার্তাটি প্রথম দেখেছো, তোমার নেতৃত্বে একটি দল বানাও। এনাদের উত্তর পাঠাও। শুভেচ্ছা জানাও।”

ফুসু অত্যানন্দে কাজে উঠে পড়ে লাগলো। কয়েকদিনের মধ্যে ফুসু লিখে পাঠালো, “তোমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে আমরা পৃথিবীর মানুষ খুবই আনন্দিত!”

ঠিক একদিন পর মঙ্গলের ভূতেরা বার্তা পেল, “তোমাদের সাথে যোগাযোগ হয়ে আমরা পৃথিবীর মানুষ খুবই বিরক্ত।”

গোল হয়ে বসে থাকা ভূতেরা এই বার্তা দেখে হতভম্ব। সাজু ভূত ফুঁসতে ফুঁসতে বললো, “কত বড় সাহস! আমরা এত সুন্দর করে হাই দিলাম, আর বজ্জাত মানুষগুলা এই জঘন্য একটা কথা লিখলো? আসার আগে কয়েকটার ঘাড় মটকে আসা উচিৎ ছিল। Rubbish.”

ভূত সমাজ সহমত পোষণ করলো।

সুধীর ভূত বললো, “আলবার্ট, এবার একটা ভাল কথা লিখে দাও। লিখো, আমরা মানুষের সাথে যুদ্ধ চাই না। আমরা শান্তির পক্ষে।”

বার্তাটি পৃথিবীতে এলো, “আমরা মানুষের সাথে শান্তি চাই না। আমরা যুদ্ধের পক্ষে!”

এই বার্তা দেখে বসে থাকা বিজ্ঞানীদের গলা শুকিয়ে গেল। এলিয়েনদের সাথে মানুষের যুদ্ধ? সাথে সাথে পৃথিবীর সকল বড় বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে বসা হলো। কি করা যায় এখন? কে জানে এলিয়েনরা সংখ্যায় কত, শক্তিতে কেমন। তবে কি মানব সভ্যতার এখানেই সমাপ্তি? মানুষেরা এবার বার্তা পাঠালো, “আমরা পরাজয় স্বীকার করছি। দয়া করে পৃথিবীতে আসবেন না।”

মঙ্গলে বসে আলবার্ট বার্তাটি পড়লো, “আমরা ডড়াই না। সাহস থাকলে পৃথিবীতে আয়!”

সাজু ভূত চিৎকার করে বললো, “গরু ছাগলের জাত। অসভ্যের জাত। How dare they?”

সুধীর ভূত বললো, “আলবার্ট, কোথাও কি কোন ঝামেলা হচ্ছে? সব কিছু কি ঠিক আছে?”

আলবার্ট মাথা চুলকে বললো, “ঠিক ধরতে পারছি না।”

“ঠিক আছে। মানুষরা যদি মঙ্গল আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আমাদেরও প্রস্তুতি গ্রহন করতে হবে। তবে তার আগে একটু পৃথিবী থেকে আমি ঘুরে আসি। তাদের প্রযুক্তির কি অবস্থা সেটা আমাদের বুঝতে হবে।”

দীর্ঘ দশদিন ঘুরে ঘুরে সুধীর ভূত পৃথিবীতে এলো।

পৃথিবী পালটে গেছে। মানুষের মাঝে আজ সুখ নেই। কারখানাগুলো পড়ে আছে। কার্বনে ভরে গেছে সব দেশ। মানব শিশুর কোন ভবিষ্যৎ নেই। মানুষের মধ্যে রোগের শেষ নেই। এ পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য। নাসাতে এসে সুধীর দেখলো ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে এখানেও। তাদের পাঠানো সকল বার্তা কোন এক যান্ত্রিক কারণে বিপরীতভাবে পৌঁছায় এবং মানুষের পাঠানো বার্তাও তাই। নিশ্চয়ই আলবার্টের কোন ভুল হয়েছে যন্ত্র বানাতে। সুধীর সব দেখেশুনে মঙ্গলের উদ্দেশ্যে ফিরে চললো।

মঙ্গলে ফিরেই সুধীর ভূত ট্রান্সমিটার নিয়ে বসলো। আজ এমন এক ভয়ংকর বার্তা সুধীর লিখলো তা দেখে আলবার্ট চমকে উঠলো। সেই সাথে দেয়া হলো অদ্ভুতুড়ে এক শর্ত। বার্তাটি পাঠিয়ে মঙ্গলের ভূতেরা আর কোনদিনই মানুষের সাথে যোগাযোগ করলো না। পৃথিবী থেকেও এলো না আর কোন উত্তর।

শেষ কথা

২১৯৯ সাল।

পৃথিবী এখন সবুজ। এত সবুজে ঘেরা বন পৃথিবী আর কোনদিন দেখে নি। কাহিনী প্রচলিত আছে আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে এক এলিয়েন গ্রুপের সাথে মানুষের যুদ্ধ হতে চলেছিল। শেষ পর্যন্ত এক অদ্ভুত শর্তে এলিয়েনরা আর পৃথিবী আক্রমণ করে নি। এলিয়েনরা নাকি লিখেছিল,

প্রিয় মানবজাতি। আমরা এক শর্তে যুদ্ধবানী তুলে নেব। যদি তোমরা পৃথিবীতে এত গাছ গাছালীতে ভরে দিতে পারো, যদি আর কোথাও সবুজের কমতি না থাকে, সব দেশে দেশে কারখানার বদলে তৈরি হয় শিশুদের খেলার মাঠ, তবেই আমরা যুদ্ধ তুলে নেব। তোমাদের একশো বছর সময় দেয়া হলো। তোমাদের আগামী শতাব্দী পবিত্র হোক।

0 Shares
Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You May Also Like

স্বপ্ন বিশারদ

বৃহস্পতিবারের শেষ বাসটা বাজারের স্টপেজে এসে দাঁড়িয়ে আছে অনেকক্ষণ। বাইরে ভয়াবহ ধরনের বৃষ্টি। একটা ছোট ছাতা অবশ্য সাথে…

রাশেদ ও মকবুল স্যার

“এক্সকিউজ মি স্যার! আপনার থেকে একটা সিংগারা পেতে পারি কি?” কলাভবনের পাঁচতলার পরীক্ষার হলের সব ছাত্রছাত্রী খেয়াল করলো,…