আলী ও কোকিল

0 Shares
0
0
0
0

শঙ্খনগর পৌঁছালাম ঠিক দুপুর বারোটায়। ঘড়ি নেই। মাথার উপর সূর্যের অবস্থান দেখে সময় বললাম। যুদ্ধের কালে অবশ্য সময় অসময় বলে কিছু হয় না। যেকোন সময় কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। সবথেকে স্বাভাবিক যে ঘটনা ঘটতে পারে তা হলো, মিলিটারিরা এসে এখনি সবাইকে গুলি করে আবার ক্যাম্পে গিয়ে খাসির ফিস্ট করতে পারে। আর সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার? এই যে আমরা ভোরে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে দুপুরের মধ্যে পনেরোজন মানুষ শঙ্খনগর পালিয়ে আসতে পেরেছি, এটাই মনে হয় অতি ভয়ংকর খবর।

আমি রাহেলা। শঙ্খনগর আমার বাবার বাড়ি। আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন এখন এখানেই অবস্থান করছে। বিয়ের সময়ের কথা মনে পড়ছে। আমার ভাসুর বিয়ে পড়ানোর ঠিক পাঁচ মিনিট আগে রাগ করে বলে উঠলো, “এই বাড়িতে ভদ্রলোকের বাস হতে পারে না। ঘরে প্রচুর গন্ধ। এটাই এই বাড়িতে তার প্রথম আর শেষ আগমন”। যাইহোক, উনিও তার শপথ ফেলে এ বাড়িতে উঠতে বাধ্য হয়েছেন। আমার শ্বাশুড়ি অবশ্য নিরীহ প্রকৃতির মানুষ। যুদ্ধ্যের প্যাঁচ এখনো বুঝতে পারেননি। গত দুদিন আমাদের বাড়িতে থেকে গেরিলা যোদ্ধাদের খাবার যাচ্ছে। রান্নাবান্না আমাকেই দেখতে হচ্ছে। একেকদিন একেক যোদ্ধা খাবার নিতে আসেন। দেখে শ্বাশুড়ি বলেন, “এরা কারা বউমা?” -আমার আত্মীয় হয় আম্মা। এ কথা শুনে শ্বাশুড়ি আমার উপর খুবই রাগ করেন। কোথায় তাদের পোলাও মাংস খাওয়াবো তার বদলে শাকভাজি খাওয়াচ্ছি, ভীষণ অন্যায়! আমি মনে মনে বলি, আম্মা আপনাকে কি করে বুঝাই এই অসময়ে বেঁচে থাকাই নিয়ামত। একদিন রান্না করছি। আচমকা এক পরিচিত কন্ঠস্বর শুনলাম। -বুবু কেমন আছো? ঘুরে দেখি আলী। এই সাড়ে তিন বছরে আলীর স্বাস্থ্যের ভালই উন্নতি হয়েছে। মনে হয় ষোলোতে পড়লো। আনন্দিত হয়ে বললাম,

“কিরে, কি খবর?”

-খুব ভাল। খাবার হয় নাই? রহমান ভাই আমাকে খাবার নিতে পাঠালো।

-তুই ও কি আবার…

আলী গর্বে বুকটা উঁচু করে বললো, “হ্যা। আমি মুক্তিবাহিনীর এসিস্টেন্ট।”

-কি রকম এসিস্টেন্ট?

আলী ফিসফিস করে বললো, “তোমাদের বাড়ির পাশে যে বড় আমগাছটা, অমন আমগাছ কয়েকগ্রামে নেই। ওই গাছের একদম উপরে পাতাফাতার ভিতরে থাকলে দূরের রাস্তা দেখা যায়। মিলিটারিরা কি কখন কি করে, কোনদিকে যায়, সব দেখা যায়। আমি গাছে বসে বসে দেখি আর রহমান ভাইকে খবর জানাই।”

আলীর কথা শুনে আমার এক অন্যরকম অনুভূতি হয়। এই সেই আলী, বৃষ্টির মধ্যে হাফ প্যান্ট পড়ে বাচ্চাদের সাথে এসে আমাদের পুকুরে ডুব দিত। সেই আলী, মা ভীষণ বকলে সারা বিকেল আমার কাছে এসে লুকিয়ে থাকতো। আজ সে স্বাধীনতা পাহাড়া দিচ্ছে। আমি বললাম, “সাবধানে থাকিস। খাবার দিয়ে দিচ্ছি। কাজ না থাকলে সন্ধ্যায় চলে আসিস। গল্প করবো।”

-আসবো। তোমাকেও অনেক গল্প শুনাবো বুবু। গাছ থেকে কত কি দেখি। তবে তোমার হাতের পায়েস খাওয়া হয় না অনেকদিন। খাওয়াতে হবে।

সন্ধ্যায় আলী এল।

-বুবু পায়েস বানাইসো?

-নারে। আজকে দুধ নেই।

-কাল নিয়ে আসবো নে সকালে।

-বস।

আলী পাটিতে বসে গল্প শুরু করে। শান্ত, স্নিগ্ধ চেহারা ধীরে ধীরে জ্বলতে শুরু করে। উত্তেজনার এক পর্যায়ে আলী পাটি থেকে লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

-বুঝলা বুবু। মিলিটারিরা খুব যে সেয়ানা, এমন না। এই যে আমি গাছে বসে থাকি, এই কথা ওদের দেশের প্রেসিডেন্টের মাথায়ও আসবে না। সেদিন রহমান ভাই ধরা পড়তো। আমি দেখি মিলিটারিরা আসতেছে। কোকিল পাখির মতো কুউ করে দুইটা ডাক দিলাম। ভাই দল নিয়ে সেইফ জোনে চলে গেল। হাদার মিলিটারিরা বুঝলোও না এইটা বর্ষাকাল! কোকিল ডাকে বসন্তে।

আলীর কথা শুনে আমি বসন্তের আশায় থাকি। এদেশের বসন্ত আসতে হয়তো সময় লাগবে। তবে আসবে। ততদিন আলী কোকিল হয়েই থাকুক। মঙ্গলবার জামিল নামের একজন খাবার নিয়ে গেল। বললো, “আজ একটা অপারেশন হবে। দোয়া করবেন বোন।” আমি উত্তেজিত হয়ে সারাদিন অপেক্ষা করলাম। ঠিক বিকালে দুমদাম গুলি শুরু হলো। বাড়ির পেছন দিক দিয়ে কারা যেন একবার দৌড়ে গেল লতাপাতার ভেতর দিয়ে। ঘরের ভেতর সবাই দম আটকে রইলাম। কিছুক্ষণ পর সব নীরব। ঘটনা কি ঘটলো তা জানতে বের হতে ইচ্ছা করছে। দরজা খুলতে যাব যাব ভাবছি। ওমনি আরেক রাউন্ড গুলির আওয়াজ। আবার বসে পড়লাম। অনেকক্ষণ পর মানুষের হইহই আওয়াজ পেলাম। বুঝলাম, বোধহয় এইযাত্রায় আমরাই জিতলাম। তবে ঘটনা কি ঘটলো তা জানতে আলীর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।

আলী আসলো না। খবর পেলাম মাগরিবের নামাযের পর। মিলিটারিরা প্রথম দফায় হারার পর আলী গাছের মধ্যে আনন্দে নড়াচড়া করে ফেলে। মিলিটারিরা দূর থেকে গাছে নড়াচড়া দেখতে পেয়ে দ্বিতীয় দফায় গাছে গুলি চালায়। আমি বাড়ি থেকে বের হলাম না। নিজেকে পাথর মনে হলো। খবর পেলাম ওই আমগাছের নিচেই আলীকে রাত দশটায় কবর দেয়া হলো। আমি রান্নাঘরে ঢুকলাম। বাইরে তখনো আলীর মায়ের চিৎকার শুনতে পাচ্ছি। আমি একবারের জন্যও বের হলাম না। ঠিক রাত বারোটায় আমি হারিকেন নিয়ে আলীর করবের সামনে আসলাম। আলীর কবর এখনো নতুন। হাত দিয়ে অনেকখানি মাটি সরালাম। শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে আনা এক বাটি পায়েস আলীর কবরে রাখলাম। পায়েসের ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। কবরের ভেতর থেকে পায়েসের ঘ্রাণে আমগাছের নিচে মোহমোহ করছে। যেন বসন্ত আসছে। কোকিল আসবে।

0 Shares
Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You May Also Like

স্বপ্ন বিশারদ

বৃহস্পতিবারের শেষ বাসটা বাজারের স্টপেজে এসে দাঁড়িয়ে আছে অনেকক্ষণ। বাইরে ভয়াবহ ধরনের বৃষ্টি। একটা ছোট ছাতা অবশ্য সাথে…

রাশেদ ও মকবুল স্যার

“এক্সকিউজ মি স্যার! আপনার থেকে একটা সিংগারা পেতে পারি কি?” কলাভবনের পাঁচতলার পরীক্ষার হলের সব ছাত্রছাত্রী খেয়াল করলো,…